এই মহাবিশ্বের বিশালতার সাথে মানবজাতিকে তুলনা করলে, এই মানবজাতি কিছুই না। কিন্তু, আমরা এখানেই বাস করছি। এই মহাবিশ্বের এক অংশেই আমরা রয়েছি। যদি গাণিতিক হিসাব ঠিক থাকে, তাহলে হয়ত আমাদের জন্য আর মাত্র ৭৬০ বছর বাকি রয়েছে। এর পরেই হয়ত আমরা বিলুপ্ত হয়ে যাব। তাহলে,

আমাদের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কারণ কি হতে পারে?? আর আমরা কি করতাম যদি আমরা আমাদের বিলুপ্তের একদম সঠিক সময়টি জানতে পারতাম?? তাহলে আমরা কি এই অত্যাবশ্যকীয় ঘটনাটি ঘটা দেরি করে দিতে পারতাম??

Bangla Projukti এর কি হত যদি সিরিজের তৃতীয় পর্বে আপনাদেরকে স্বাগতম এবং আজকে আমরা জানব যে,

কি হত যদি আমরা মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার নির্ভূল সময়টি জানতে পারতাম??

তো, চলুন আপনাকে এই অজানা সম্পর্কে কিছু ধারণা দেয়া যাক;

সাল ১৯৯৩

পৃথিবীতে মানবজাতির সময় স্বল্প; এ কথাটি জানা স্বত্বেও জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী J. Richard Gott ১৯৯৩ সালে শুধুমাত্র পরিসংখ্যান এর উপরে ভিত্তি করে খুবই ভয়ংকর একটি ভবিষ্যতবাণী করেন।

মূলত, তিনি গণনা করে এটা নির্ণয় করেছেন যে, ৫০ শতাংশ সুযোগ রয়েছে যে মানবজাতির শেষ ২৭৭৯ সালের কিছুটা আগে আসবে।

এক্ষেত্রে আমরা ৭৬০ বছর সময় পাচ্ছি যে সময়ের মধ্যে আমাদের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে হবে এবং, সম্ভব হলে, পৃথিবীকে একটি নতুন জীবন প্রদান করতে হবে।

আর এগুলো না করতে পারলে, আমাদেরকে এই গ্রহটি পুরোপুরিভাবে ছেড়ে চলে যেতে হবে।

আমাদের সাথেই থাকুন কারণ আমরা এখন আপনাদেরকে নিয়ে যেতে চলেছি এক যাত্রায় সেখানে আমরা আপনাকে দেখাব যে মানবজাতির ভবিষ্যতে কি হতে চলেছে।

সাল ২০২৯

২০২৯ সালের এপ্রিল মাসের ১৩ তারিখে, Apophis নামের একটি গ্রহাণু যেটি বর্তমানে পৃথিবীর দিকে এগিয়ে আসছে, সেটি পৃথিবীর প্রায় ৩১,০০০ কিলোমিটার কাছে এসে পৃথিবীকে এক নজর দেখে আবার নিজের পথে বেড়িয়ে পড়বে।

এই দূরত্ব পৃথিবী ও চাঁদের দূরত্বের থেকেও ১০ গুণ কম। আর এই দূরত্ব আমাদের কক্ষপথে থাকা কিছু স্যাটেলাইট এর দূরত্ব থেকেও কম।

কিন্তু, এই ৩৭০ মিটার প্রশস্ত গ্রহাণু পৃথিবীকে আঘাত করবে না। এটি পৃথিবীর গা ঘেঁসে দ্রুত চলে যাবে এবং সূর্যের চারিদিকে এর ভ্রমণ বজায় রাখবে।

সাল ২০৩০

জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি কোন মা-বাবাকে তাদের সন্তানের জিনগত বৈশিষ্ট্য তাদের ইচ্ছামত নির্ধারণ করতে সহায়তা করবে। ঠিক একই সময়ে, এই গ্রহের জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে সাড়ে ৮ বিলিয়নে।

পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র এতটাই দ্রুত পরিবর্তিত হবে যা আমরা আগে কখনোই কল্পনা করতে পারিনি। এর একমাত্র কারণ হবে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি।

আর মহাকাশে, রকেটের বিভিন্ন স্টেজের অংশ, এবং, হঠাৎ করে দুই স্যাটেলাইটের মধ্যে ঘটা সংঘর্ষের কারণে তৈরি হওয়া বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ মহাকাশে পৃথিবীর চারিদিকে একটি ময়লার/ধ্বংসাবশেষের দেয়াল তৈরি করবে।

এটি যেকোনো মহাকাশযানকে পৃথিবীর বাইরে যাওয়া থেকে বাধা দান করবে। এজন্য, আমাদের অবশ্যই আমাদের মহাকাশকে পরিষ্কার করার একটি উপায় খুঁজে বের করতে হবে। তা না হলে আমাদের হয়ত সারাজীবনই এই গ্রহে আটকে থাকতে হবে।

যদি আমরা এই সমস্যার কোন সমাধান বের করতে পারি, তাহলে হয়ত এটাই আমাদের চাঁদে অথবা মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপন করতে সহায়তা করবে। আর হয়ত এটাই হবে পৃথিবীর বাইরে সফলভাবে স্থায়ী বসতি স্থাপনের শুরু।

সাল ২০৪৫

পৃথিবীর বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা আগের তুলনায় প্রায় দেড় ডিগ্রি বৃদ্ধি পাবে যেটি নিরাপদ তাপমাত্রার সীমা কে অতিক্রম করবে। যদিও, মানবজাতি সেই সময়ের মধ্যে শক্তির উৎস হিসেবে একদম পরিষ্কার শক্তির উৎসে (যেমন; সৌরশক্তি) পরিবর্তিত হয়ে যাবে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন খুবই মারাত্বক আকার ধারণ করবে এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন হয়ে যাবে।

পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে, The Great Barrier Reef প্রায় ৯০ শতাংশ প্রবাল হারিয়ে ফেলবে। আর হ্যাঁ, The Great Barrier Reef পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রবাল প্রাচীর।

আমাজন বনাঞ্চলের অনেক বড় একটি অংশ দাবানল এবং বন নিধনের কারণে হারিয়ে যাবে। যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর প্রাণীকুলকে সংরক্ষণ করার প্রচেষ্টা চালানোর পরেও, প্রায় ১০ লক্ষ প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যেতে শুরু করবে।

এর মাধ্যমেই পৃথিবীর ইতিহাসে পরবর্তী গণহারে প্রাণী বিলুপ্তির সূচনা হবে। কিন্তু, এর আগের বারে, এই বিলুপ্তির কারণ ছিল একটি বৃহৎ উল্কাপিণ্ডের আঘাত। আর এবার এর কারণ হবে মানুষ।

সাল ২০৫৬

পৃথিবীর জনসংখ্যা বেরে ১০ বিলিয়নে গিয়ে দাঁড়াবে। বিগত ৩ মিলিয়ন বছরের ইতিহাসে এই সময়েই পৃথিবী সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত থাকবে। চরম আবহাওয়া বিশ্বজুড়ে তাণ্ডব চালাবে। আফ্রিকা, মধ্য প্রাচ্য এবং দক্ষিন-পূর্ব এশিয়া বন্যা, হারিকেন এবং খরা দ্বারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হবে।

পৃথিবীর এক অংশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে এবং প্রায় ১৪০ মিলিয়ন মানুষকে অন্য কোথাও আশ্রয়ের খোজ করতে হবে।

সাল ২০৮০

বায়োটেকনোলজিক্যাল প্রতিস্থাপন প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে। এর ফলে মানুষ তাদের প্রযুক্তির সাথে বায়োলজিক্যাল একটি পর্যায়ে মিশে পড়বে। মানুষের বিশেষ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ হবে টেকনোলজিক্যাল যেখানে তাদের ব্রেইন, হৃৎপিণ্ড ইত্যাদি হবে রক্ত, মাংসের।

এ সময় তাদের এমন কিছু অঙ্গ থাকবে যেগুলো কখনই কাজ করা বন্ধ করে দিবে না। তাদের থাকবে কৃত্রিম রক্ত, এবং তাদের ন্যানো-স্কেল ব্রেন ইন্টারফেস একটি নতুন বাস্তবতা নিয়ে আসবে।

সাল ২০৯৯

সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৬ মিটার বেরে যাবে যেটি শত কোটি মানুষকে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করবে। অনেক বড় আকারের একটি উচ্ছেদ ব্যবস্থা এবং পূনর্বাসন ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে। এই কাজ করার জন্য ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত খরচও হতে পারে।

বিভিন্ন পরিবেশগত কারণে ও অনেক মানুষের মৃত্যুর কারণে পৃথিবীর জনসংখ্যা ১১ বিলিয়নে গিয়ে স্থির হয়ে যাবে।

সাল ২১৮০

২১৮০ সালের মধ্যেই, মানবজাতি আমাদের সৌরজগতের মধ্যে আরও ছড়িয়ে পড়বে। বিভিন্ন গ্রহাণু খনন করা থেকে শুরু করে মঙ্গল গ্রহকে বসবাসযোগ্য আকার দান করার প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। আরও বেশি মানুষের কাছে মহাকাশ প্রযুক্তি পৌঁছানো সম্ভব হবে এবং নতুন এক ধরণের সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টি হবে।

সেই সময়ে, বিভিন্ন মহাকাশযান হ্যাক করে বিভিন্ন গ্রহাণুকে পৃথিবী এবং চাঁদের দিকে পাঠিয়ে দেয়া সম্ভব হবে। মহাকাশে অবকাঠামো কম থাকার কারণে মহাকাশের অন্যান্য গ্রহে থাকা কলোনিগুলো বিশেষ দিক দিয়ে দুর্বল হয়ে পড়বে।

সাল ২২৮০

Antimatter Propulsion দ্বারা চালিত মহাকাশযানের মাধ্যমে মানুষ এই সৌরজগতের বাইরে যেতে পারবে। অটোমেটিক মানুষহীন স্পেস প্রোব গ্যালাক্সির বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হবে। এগুলো হাজার হাজার গ্রহের তথ্য মানুষের কাছে পাঠাবে। ২৩ শতক শেষ হতে না হতেই মানুষ এক ক্ষুদ্র এলিয়েন জীব আবিষ্কার করবে যেটি একটি উষ্ণ এক্সোপ্ল্যানেটে থাকবে যেটি আমাদের সৌরজগত থেকে ১০০ আলোকবর্ষ দূরে।

সাল ২৩০০

বহু শতক ধরে Nano technology নিয়ে গবেষণা এবং তার উন্নতির পর এটি এই পৃথিবী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন একটি পরিবর্তন আনবে যেটি মানুষকে Trans Humans অথবা Cyborg এ পরিণত করবে। এইরকম মানুষের উন্নত বুদ্ধিমত্তা এবং অধিক শক্তি থাকবে।

অনেক সুপারহিরোদের বৈশিষ্ট্য এর মধ্যে একটি হল জোরে দৌড়ানো। আর এইসকল মানুষ এই কাজটি অতি সহজেই করতে পারবে। তারা অদৃশ্যও হয়ে যেতে পারবে এবং ইচ্ছামত তাদের আকার পরিবর্তন করতে পারবে।

সাল ২৫০০

মানবজাতি Kardashev Scale এ টাইপ ০ এর সভ্যতা থেকে টাইপ ১ এর সভ্যতায় রূপান্তরিত হবে। এর অর্থ হল মানুষ পৃথিবীতে থাকা সকল শক্তি সংগ্রহ করে পুরো মানবসভ্যতাকে চালাতে পারবে। এর মধ্যেই তারা পৃথিবীর আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূমিকম্পকে নিয়ন্ত্রণ করার মত প্রযুক্তি আবিষ্কার করে ফেলবে। আর তারা সমুদ্রের নিচে অনেক শহর গড়ে তুলবে।

এর পরের ধাপ হবে সূর্যের শক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার জন্য একটি পথ আবিষ্কার করা। এর জন্য তারা পৃথিবীর বাইরে Dyson Sphere নামের একটি বিশাল কাঠামো তৈরি করতে পারে।

সাল ২৭৭৯

এই আগেরকার দিনগুলোর বিভিন্ন কাজের জন্য মানুষ এখন ফল ভোগ করতে শুরু করবে। এ জন্য হয়ত আমাদের দ্বারা তৈরী বিভিন্ন স্পেস কলোনিতে চলে যেতে হতে পারে। অথবা, এই ‘আমরা’ শব্দের কোন মানেই হয়ত তখন থাকবে না। কারণ আমরা তখন বায়োটেকনোলজিক্যালি পরিবর্তিত একটি প্রজাতিতে পরিণত হব।

হ্যা, অবশ্যই এই সব তথ্য শুধুমাত্র ধারণা এবং পরিসংখ্যান এর উপরে ভিত্তি করে তৈরী। যদি আপনি মানবজাতির বিলুপ্তির জন্য একটূ কষ্ট বোধ করেন, তাহলে আপনাকে বলি যে, এই সবকিছু সত্য হওয়ার মাত্র ৫০ শতাংশ সুযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞানীরা আমাদের বিলুপ্তির সময় সেই পদ্ধতির মাধ্যমে তৈরী করেছেন ঠিক যে পদ্ধতিতে মার্কেটাররা নির্ধারণ করেন যে আপনি অনলাইনে কি কিনতে ইচ্ছুক বা আপনি কাকে ভোট দিতে পারেন।

এই সবকিছু শুধুমাত্র সম্ভাবনা। এখানকার কোন কিছুরই নিশ্চয়তা নেই।

কিছু কিছু গবেষণা এটা বলে যে এখন থেকে ৭৬০ বছর নয়, বরং এখন থেকে আমরা ১০০০০ বছর পরে বিলুপ্তির মুখ দেখতে পারি।

যদি তাই হয়, তাহলে আমরা ৩৫০০ সালে পৃথিবীর দুই মেরুকে উলটো হয়ে যেতে দেখতে পারি। এবং ৪০০০ সালের কিছু পরে আমরা কম্পিউটারের সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেখতেও পারি।

কিন্তু,

এত কিছু আগে থেকে জেনে রাখা কিভাবে আমাদের জীবনধারাকে বদলে দিতে পারে??

যদি আমরা ১০০ শতাংশ নিশ্চয়তার সাথে আমাদের বিলুপ্ত হওয়ার সময় জানতে পারতাম, তখন আমরা আমাদের পরিবেশ এবং আমাদের শরীর নিয়ে মাথা ঘামানো বন্ধ করে দিতাম। আমরা সেই সকল খারাপ কাজের দিকে মন দিতাম যেগুলো আমাদেরকে অল্প সময়ের জন্য খুশি এনে দেয়।

আমাদের সমাজ তখন আরো হিংসাত্মক হয়ে উঠত। তারা নিজেরাই নিজেদের জন ক্ষতিকারক হয়ে উঠত। তারা যুদ্ধ শুরু করে দেয়ার জন্য আরো আগ্রহী হয়ে উঠত।

অথবা, আমরা দল বেধে এই পাথরের খন্ড ছেড়ে চলে যেতে পারতাম। আমরা আমাদের সৌরজগতের সকল ভাল দিকগুলো ছেড়ে আরো দূরে চলে যেতে পারতাম যেখানে আমাদের জন্য আরো ভাল কিছু রয়েছে।

আমরা এমন কিছু কলোনি গঠন করতে পারতাম যেখানকার জনসংখ্যা সুনিয়ন্ত্রিত। সেক্ষেত্রে, যদি পৃথিবী কোন মহাজাগতিক শক্তির ফলে ধ্বংস হয়ে যায়, মানুষ তবুও বাস করতেই থাকবে। তারা ততক্ষণ বেচে থাকতে পারবে যতক্ষণ না পুরো মহাবিশ্ব ধ্বংস হয়ে যায়।

ভাল কথা, মানুষ আদৌ কি পুরো মহাবিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরেও টিকে থাকতে পারবে??

সেটা ‘কি হত যদি‘ এর আরেকটি পর্বের জন্য রইল।

আরো পড়ুন

কি হত যদি আপনি আপনার ব্রেইন আপলোড করতে পারতেন??

কি হত যদি একটি ব্ল্যাক হোল পুরো মহাবিশ্বকে একদম মুছে ফেলত??

যাবেন নাকি মহাকাশে ?