কোন সিকিউরিটি ব্যবস্থাই ১০০ শতাংশ নিরাপদ নয়। যেমনঃ যেকোনো তালাই ভেঙ্গে ফেলা যায়, যেকোনো সিন্দুক ভেঙ্গে ফেলা যায়, যেকোনো গাড়ি খুলে ফেলা যায়। এবং, অনলাইন পাসওয়ার্ডের জন্য এর উপরে যথেষ্ট সময় আর প্রযুক্তি ব্যয় করলেই তা ভেঙ্গে ফেলা সম্ভব। তাহলে, কেমনে আমরা কোন কিছুকে নিরাপত্তা দিতে পারব??

এর সমাধান বলতে গেলে আমরা এখনকার প্রযুক্তির উপরে নির্ভর করতেই পারি। কারণ প্রযুক্তির উন্নতির সাথে অনেক কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছে মানুষ। আর সিকিউরিটির বিষয়টি মানুষের উন্নয়নের লিষ্ট এ সবার আগে ছিল। বর্তমানের সবচেয়ে নিরাপদ সিকিউরিটি সিস্টেম হল বায়োমেট্রিক সিকিউরিটি। এর মধ্যে আছে ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ফেস স্ক্যান, আইরিশ স্ক্যান এবং আরো অনেক কিছু যার মাধ্যমে আপনি কোন কিছুকে নিরাপত্তা প্রদান করতে পারবেন।

পূর্বের দিন গুলোতে, পুলিশ স্টেশনে ছোট-বড় অপরাধী ছাড়া আর কারো ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়া হত না। কিন্তু, বর্তমানে অনেক সাধারণ মানুষ পর্যন্ত তাদের ফোন আনলক করার জন্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহার করেন। বিষয়টি একবার ভেবেই দেখুন না। আগে শুধুমাত্র অপরাধীদের সনাক্ত করণের জন্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহার করা হত। এখন মোবাইল ফোন তাদের ব্যবহারকারী সনাক্ত করার জন্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহার করে।

আর প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে এখন তো প্রায় সব স্থানেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর ব্যবহার দেখা যায়। এখন, আপনি ল্যাপটপে, স্মার্টফোনে, উচ্চ সিকিউরিটি সমৃদ্ধ বিভিন্ন বিল্ডিং এ, ATM মেশিনে এমনকি সিম কার্ড কেনার সময়ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিডার ব্যবহার করা হয়।

তো, এত সব যায়গায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিডারের ব্যবহার দেখে আপনার হয়ত মনে হতেই পারে যে,”এটা কাজ করে কিভাবে??” তো, চলুন আপনাকে পুরো বিষয়টি খুলে বলি।

ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পর্কে জানার আগে এটা তো জানা দরকার যে অন্যান্য সিকিউরিটি সিস্টেম থাকা সত্বেও কেন মানুষ এমন গণহারে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর ব্যবহার করে??

তো,

ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর এত লাফ ধাপ কেন??

আপনার ভাগ্য যদি খুব খারাপ না হয়ে থাকে, আল্লাহ্ যদি আপনাকে একটি হাত দিয়ে থাকে, তাহলে আমি নিশ্চিত যে আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্ট আছে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট হল মানুষের আঙ্গুলে থাকা বিশেষ এক ধরণের নকশা বা ছাপ। আর হ্যা, এই নকশার জন্যই আপনার হাতে ঘর্ষণ সৃষ্টি হয় এবং আপনি বিভিন্ন বস্তু ধরতে পারেন।

আশ্চর্যজনক ব্যাপারটি হল, আমাদের প্রত্যেকের ফিঙ্গারপ্রিন্ট মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায়ই তৈরী হয়ে যায় এবং তা গর্ভে থাকার ৭-৮ মাসের মধ্যেই তৈরী হয়ে যায়। যদি খারাপ কিছু না ঘটে, তবে আপনার হাতের আঙ্গুলের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সারা জীবনই একই রকম থেকে যাবে। আর যেহেতু প্রত্যেকের হাতের ছাপ একদম আলাদা হয়ে থাকে, তাই আপনার হাতের ছাপ দিয়ে আপনাকে সনাক্ত করার ছাপটি আরো সহজ হয়ে যায়।

Fingerprint Digital Code
Fingerprint Digital Code

মানুষের DNA তে থাকা কোডের জন্য সকলের ফিঙ্গারপ্রিন্ট আলাদা হয়ে থাকে। তাছাড়া, মায়ের গর্ভে যখন সন্তান থাকে, তখন সেখানকার পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে থাকে। এজন্য জময ভাই বোনদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও কিছুটা আলাদা হয়ে থাকে। হ্যা, একজনের সাথে অন্যজনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলে যেতেই পারে, তবে সেটা অনেক দূর্লভ একটি ব্যাপার।

যেহেতু, বর্তমানের ভার্চুয়াল জগতে সকলের ফিঙ্গারপ্রিন্ট আলাদা হয়ে থাকে, তাই পিন বা পাসওয়ার্ডের জায়গায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহার করা অনেকটা সুবিধাজনক। এই পদ্ধতিতে আপনাকে কিছুই মনে রাখতে হচ্ছে না। আপনি নিজেই আপনার মোবাইলের আনলক সিস্টেম।

ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাচাই ও তা সংরক্ষণ

বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দুইটি আলাদা ধাপে কাজ করে। প্রথম ধাপটির নাম হল Enrollment। এই ধাপে আপনার ডিভাইস আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যান করে সেটাকে কিছু ডিজিটাল কোডে রুপান্তরিত করে এবং তা আপনার মোবাইলের ডেটাবেজে সংরক্ষিত করে রাখে। আপনার ডিভাইসে থাকা ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার অর্ধেক সেকেন্ডের মধ্যে আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর ডেটা আপনার ডেটাবেজে স্টোর করে রেখে দিতে পারে। এরপর যখনই দরকার, আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার আপনার ডেটাবেজে থাকা তথ্যগুলোকে ৯৯ শতাংশ সময় সঠিকভাবে মিলানোর ক্ষমতা রাখে।

Enrollment শেষ হলেই আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্ট কাজ করার জন্য তৈরী। এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপ যার নাম Verification. যারা সেই সিস্টেমের অ্যাক্সেস পেতে চাইবে, তাদের আঙ্গুলকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিডারের উপরে ধরতে হবে। এরপর, ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিডার আপনার ডিভাইসে থাকা ডেটার সাথে আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর ডেটা মিলিয়ে দেখবে। অর্থাৎ, সেই ফিঙ্গারপিন্ট রিডার আপনার আঙ্গুলের ছাপ এবং আপনার ডেটাবেসে থাকা ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর সাথে মিলিয়ে দেখবে। যদি এই দুই তথ্য মিলে যায়, তবে আপনার ডিভাইস সাথে সাথেই আনলক হয়ে যাবে।

Fingerprint Verification and Storing

১৯০০ সালের প্রথম দিকে অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে এবং অপরাধী সনাক্ত করতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহার করত। কিন্তু, সে সময়কার ফিঙ্গারপ্রিন্ট ভেরিফিকেশন পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। তখন আতশ কাঁচ বা ম্যাগনিফাই গ্লাস ব্যবহার করে একটি ফিঙ্গারপ্রিন্ট অন্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর সাথে মিলানো হত। প্রথমে তারা অপরাধের স্থান থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করত এবং সন্দেহভাজন লোকের ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর সাথে তা ম্যানুয়ালি ম্যাচ করানোর চেষ্টা করা হত।

আর ম্যানুয়ালি কোন ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেলানো সহজ কোন ব্যাপার না। তবে এর পিছনে অনেক ফরেনসিক বিজ্ঞানীরা থাকত। কম্পিউটার যখন ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেলানোর চেষ্টা করে, তখন কিন্তু সে একটি আতশ কাঁচ নিয়ে খুঁতিয়ে দেখে না। সে তার ডেটাবেজে থাকা হাজার বা লাখ লাখ ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর সাথে সেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করে।

যখন Enrollment হয়, তখন কম্পিউটার হাতের হাতের নকশার দূরত্ব ও রেখাগুলোর বিভিন্ন এলাকার কোণ মেপে রেখে তা ডিজিটাল কোডে পরিণত করে। পরে, কেউ ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিডারে তার আঙ্গুল রাখলে যদি এই কোড মিলে যায়, তার মানেই হবে যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচ করেছে এবং ডিভাইস আনলক হয়ে যায়।

কিন্তু,

এই ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার কিভাবে কাজ করে??

আগের দিনে পুলিশ ষ্টেশনে একটি ইঙ্ক প্যাডের উপরে আঙ্গুল রেখে তারপর তা একটি সাদা কাগজের উপরে রাখতে বলা হত। এভাবে সাদা কাগজের উপরে আঙ্গুলের একটি ছাপ বা ইম্প্রেশন তৈরী হয়ে থাকত। এটি পরে কম্পিউটারে স্টোর করা হত। কিন্তু যখন কোন বিল্ডিং এর দরজা খোলার প্রয়োজন পরবে বা আপনার স্মার্ট ডিভাইস আনলক করার প্রয়োজন পরবে তখন কি করবেন?? তখন তো দ্রুত কিছু প্রয়োজন পড়বে। তাহলে, ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার এই ক্ষেত্রে কিভাবে কাজ করবে??

সাধারণত দুই ধরণের ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার বা রিডার দেখতে পাওয়া যায়। এদের একটি হল অপটিক্যাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার এবং অন্যটি হল ক্যাপসিটিভ স্ক্যানার। অপটিক্যাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার প্রথমে আপনার আঙ্গুলের উপরে একটি আলোর রেখা ছুড়ে মারে। তারপর ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিডারে থাকা স্ক্যানার আপনার আঙ্গুলের ডিজিটাল ইমেজ তৈরী করে। এটি সেইম একটি ফটোকপি মেশিনের মত। আপনি যদি আপনার হাত একটি ফটোকপি মেশিনের উপরে রাখেন তাহলে মেশিনটি আপনার হাতের একটি প্রতিলিপি তৈরী করে দিবে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিডার একইভাবে কাজ করে। এটি আপনার আঙ্গুলের একটি স্ক্যান তৈরী করে। তারপর কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই ছবি আনালাইজ করে শুধুমাত্র ফিঙ্গারপ্রিন্ট টি রেখে দিয়ে সেটি দিয়ে একটি ডিজিটাল কোড তৈরী করে। তারপর কি হয় তা তো উপরে বর্ণনা করলামই।

আরো পড়ুন –

১) Face Unlock কিভাবে কাজ করে?এটি কতটা নিরাপদ?

২) Xiaomi Mi Mix Alpha – ২ লক্ষ ৩৮ হাজার টাকার মোবাইল