নতুন ল্যাপটপ কেনার পর করণীয়

আগে ল্যাপটপ ছিল শুধু বিলাসিতার জিনিস, এখন বহনের সুবিধা ও অন্যান্য দিক থেকে ডেস্কটপের চাইতে ল্যাপটপ বেশি জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ল্যাপটপ ব্যবহারে যারা একদমই নতুন তারা ল্যাপটপের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে না জানার কারণে প্রায়ই বিভিন্ন সম্মুখীন হন। নতুন ল্যাপটপ কেনার পর করণীয় কাজগুলো করলে এসব সমস্যা অনেকাংশে দূর করা সম্ভব। এই আর্টিকেল থেকে জানতে পারবেন নতুন ল্যাপটপ কেনার পরে আপনাকে কি কি কাজ করতে হবে।

নতুন ল্যাপটপ কেনার পর করণীয়,নতুন ল্যাপটপ কেনার পর করণীয়,ল্যাপটপ কেনার সময় করণীয়,ল্যাপটপ কেনার আগে খেয়াল করবেন,নতুন ল্যাপটপ কেনার পর করণীয়

নতুন ল্যাপটপ কেনার পর করণীয় কাজগুলো দেওয়া হলো

ইন্টারনেট সংযোগ চালু করুন

নতুন ল্যাপটপটি প্রথমে চালু করুন, এরপরে এখানে ইন্টারনেট সংযোগ চালু করে নিন। তার জন্য আগে একটি শক্তিশালী ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কের সাথে ল্যাপটপটি কানেক্ট করবেন। কারণ নতুন ল্যাপটপে অনেক কিছু আপডেট বা ইনস্টল করা লাগবে। তাই ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কটির স্পীড যদি কম থাকে বা এটি যদি সুরক্ষিত না থাকে তাহলে পরবর্তী কাজগুলো নির্বিঘ্নে করতে পারবেন না।

অপারেটিং সিস্টেম আপডেট করুন

ল্যাপটপ এবং ইন্টারনেট সংযোগ চালু করার পরে সবার আগে অপারেটিং সিস্টেম বা OS টি আপডেট করে নিবেন। কারণ আপনি কেনার আগে ল্যাপটপটি বহুদিন পর্যন্ত মার্কেটে ছিল। উৎপাদনকারী কোম্পানি থেকে আসার সময়ে ল্যাপটপে OS এর যে ভার্সনটি ছিল, দীর্ঘদিন মার্কেটে থাকার কারণে তা ইতোমধ্যেই পুরনো এবং দুর্বল হয়ে গেছে। পুরনো অপারেটিং সিস্টেমে ল্যাপটপ চালালে আশানুরূপ পারফরমেন্স পাবেন না। তাই লেটেস্ট সব ফিচারের এক্সেস পেতে এবং ল্যাপটপটি সুরক্ষিত রাখতে OS টি আপডেট করে নিবেন।

সিস্টেম আপডেটিংয়ের সময়ে ল্যাপটপ কয়েকবার রিস্টার্ট হতে পারে। রিস্টার্টের পরে আপডেট ঠিকমতো হয়েছে কিনা সেটার দিকে খেয়াল রাখবেন, প্রয়োজনে পুনরায় সিস্টেম আপডেট করা লাগতে পারে। আর অটো আপডেট অপশনটি বন্ধ রাখবেন। কারণ, যদি OS টি নকল হয়, তাহলে অটো আপডেটে ল্যাপটপটি ভাইরাস আক্রান্ত হতে পারে। আবার অটো আপডেট যেহেতু ইন্টারনেট সংযোগ চালু থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়, হুটহাট আপডেটে কাজের মাঝে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

ড্রাইভার আপডেট করুন

অপারেটিং সিস্টেমের মতো ল্যাপটপের ড্রাইভারগুলোও আপডেট করা জরুরি ভালো পারফরমেন্স নিশ্চিত করার জন্য। আপডেটেড ড্রাইভার বিভিন্ন রকমের বাগ থেকে সিস্টেমকে মুক্ত রাখে।

সাধারণত কম্পিউটার কেনার সময়ে দোকান থেকেই একটি ডিস্ক দিয়ে দেয় যাতে ড্রাইভারগুলো থাকে। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় ড্রাইভারগুলো ইনস্টল বা আপডেট করা যায়। যদি ল্যাপটপ কেনার সময়ে এরকম ডিস্ক না পান তাহলে চিন্তার কিছু নেই। ব্রাউজারে ল্যাপটপের মাদারবোর্ডের মডেল নাম্বার লিখে সার্চ করলে ড্রাইভারের লেটেস্ট আপডেট পেয়ে যাবেন।

অ্যান্টিভাইরাস ডাউনলোড করুন

অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ফাইল ট্রান্সফার ও ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ের সময়ে আপনার ল্যাপটপটিকে ভাইরাসের হাত থেকে বাঁচাবে। সাধারণত উইন্ডোজ ১০-এর ল্যাপটপে ডিফেন্ডার সফটওয়্যার বিল্ট-ইন থাকে, তাই ভাইরাস অ্যাটাকের তেমন ঝুঁকি থাকে না।

তবুও বাড়তি প্রোটেকশনের জন্য একটি ভালোমানের ফ্রি অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ডাউনলোড এবং ইনস্টল করে নিতে পারেন। কিন্তু ম্যাক এবং লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেমের ল্যাপটপে বিল্ট-ইন ডিফেন্ডার থাকে না৷ সেক্ষেত্রে অ্যান্টিভাইরাস ডাউনলোড করা বাধ্যতামূলক।

অ্যান্টি-থেফট ফিচার অ্যাক্টিভেট করুন

শুধু ল্যাপটপ চুরি হয়ে গেলে বা হারিয়ে গেলে আর্থিক ক্ষতি ছাড়া তেমন কিছু হবে না। কিন্তু যদি ল্যাপটপের ভিতরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ফাইল সহ ল্যাপটপ হারিয়ে যায় তখন? এই দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আপনাকে আগে থেকেই অ্যান্টি-থেফট ফিচারটি অ্যাক্টিভেট করে রাখতে হবে। সেটিংস থেকে Find My Device নামের অপশনটি চালু করুন। এটি আপনার হারিয়ে যাওয়া বা চুরি হয়ে যাওয়া ল্যাপটপের লোকেশন ট্রেস করতে সাহায্য করবে।

সফটওয়্যার নির্বাচন করুন

কিছু কিছু অপ্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ল্যাপটপে আগে থেকেই প্রি-ইনস্টলড থাকে বা সিস্টেম আপডেট করার সময়ে চলে আসে। এগুলোকে এক কথায় বলা হয় ব্লোটওয়্যার। ব্লোটওয়্যার প্রায়ই অকেজো থাকে, অযথা স্পেস আটকে রাখে, এবং ল্যাপটপের গতি কমিয়ে দেয়।

তাই ল্যাপটপের কন্ট্রোল প্যানেল থেকে খুঁজে খুঁজে ব্লোটওয়্যার রিমুভ বা আনইনস্টল করুন। যদি ল্যাপটপটি উইন্ডোজ সিস্টেমের হয় তাহলে ব্লোটওয়্যার রিমুভাল বাধ্যতামূলক। কিন্তু ল্যাপটপটি যদি ম্যাক, লিনাক্স, বা ক্রোম অপারেটিং সিস্টেমের হয় তাহলে ব্লোটওয়্যার রিমুভ না করলেও চলবে। কারণ এসব সিস্টেমে ব্লোটওয়্যার তেমন সমস্যার সৃষ্টি করে না। ব্লোটওয়্যার আনইনস্টল করার পরে নিজের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যারগুলো এক এক করে ইনস্টল করে নিন।

ফাইল ব্যাকআপ রাখুন

বহুদিন ধরে ল্যাপটপ ব্যবহার করছেন, কিন্তু হঠাৎ করে একদিন এটি কাজ করা বন্ধ করে দিলো। তখন সার্ভিসিং করা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না৷ কিন্তু সার্ভিসিংয়ের পর আপনার সব ডেটা, ফাইল যে অক্ষত থাকবে সেই গ্যারান্টি কিন্তু দেয়া যায় না।

এসব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই নতুন ল্যাপটপে Automated Backup অপশনটি সেট আপ করে দিবেন। এটি আপনার ল্যাপটপের সব ডকুমেন্ট ব্যাকআপ রাখবে, ফলে আকস্মিক ক্র্যাশ বা সার্ভিসিংয়ের পরে সব ডেটা ও ফাইল পুনরুদ্ধার করতে পারবেন।

ক্লাউড স্টোরেজ সিঙ্কিং ফাইল ব্যাকআপ রাখার জন্য আরেকটি ভালো অপশন। এই স্টোরেজের অন্তর্ভুক্ত গুগল ড্রাইভ, ড্রপবক্স ইত্যাদিতে আপনার ফাইলগুলো আপলোড করে রাখতে পারেন। এতে আপনি যেকোন সময় যেকোন ডিভাইসে সাইন ইন করে ফাইলগুলোর এক্সেস পাবেন।

পাওয়ার সেটিংস অপটিমাইজ করুন

প্রয়োজনীয় সবকিছু আপডেট, ইনস্টল, বা সেট আপ করার পরে সেটিংস থেকে কিছু জিনিস অপটিমাইজ করা জরুরি। এগুলো আপনার ল্যাপটপের পারফরমেন্সের স্বার্থে করতেই হবে, নয়তো নতুন অবস্থাতেই ল্যাপটপের ব্যাটারি দুর্বল হয়ে চার্জ দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। পাওয়ার সেটিংসে গিয়ে ব্রাইটনেস এমনভাবে সেট করে নিন যাতে স্ক্রিন বেশি উজ্জ্বল বা ম্লান না থাকে। আর Power Saver Mode টি অন করে রাখবেন, তাতে ব্যাটারির চার্জ তাড়াতাড়ি শেষ হবে না। ব্লুটুথ, ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাপস ইত্যাদি চার্জ বেশি খরচ করে, তাই এগুলোও বন্ধ করে রাখবেন।

ভিপিএন ইনস্টল করুন

ভিপিএন বা ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা বা না করা সম্পূর্ণ আপনার ব্যাপার। কিন্তু ভিপিএন সফটওয়্যার আপনার ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কটি হ্যাকার এবং থার্ডপার্টির নজর থেকে বাঁচিয়ে রাখবে। আবার ভিপিএনের সাহায্যে আপনি আপনার এরিয়ায় রেস্ট্রিক্টেড ওয়েবসাইট বা বিষয়বস্তু ব্রাউজ করতে পারবেন। মোট কথা, ভিপিএন সফটওয়্যার আপনার ল্যাপটপের পারফরমেন্স আরো বাড়িয়ে তুলতে সক্ষম। তাই অনলাইন থেকে একটি ভালো ভিপিএন সফটওয়্যার ডাউনলোড করে সেট আপ করে নিন।

নতুন ল্যাপটপ চার্জ দেয়ার নিয়ম

নতুন ল্যাপটপ কতক্ষণ চার্জ দিতে হয় সে সম্পর্কে ল্যাপটপের প্যাকেটে বিস্তারিত বর্ণনা করা থাকবে। তারপরও সহজ করে বলছি, ল্যাপটপে চার্জ দেয়ার নিয়ম হলো ব্যাটারি পুরোপুরি ড্রেইন আউট না করে চার্জ দেয়া।

অর্থাৎ চার্জ দেয়ার আগে দেখবেন ল্যাপটপে কতটুকু চার্জ অবশিষ্ট আছে। যতটুকু থাকবে ততটুকু সম্পূর্ণ শেষ করা যাবে না, ২০% চার্জ অবশিষ্ট থাকতে নতুন করে চার্জ দিতে হবে। বর্তমানের ল্যাপটপগুলোতে লিথিয়াম-আয়ন বা লিথিয়াম-পলিমার ব্যাটারি থাকে। এসব ব্যাটারির ক্ষেত্রে অবশিষ্ট চার্জ সম্পূর্ণ শেষ করে নতুন করে চার্জ দেয়া মানে ব্যাটারির কর্মক্ষমতা কমিয়ে ফেলা। আবার ল্যাপটপ যখন চার্জ দিবেন, তখন পুরোপুরি বা ১০০% চার্জ না দেয়াই ভালো। সর্বোচ্চ ৮০% – ৮৫% চার্জ দিলে ব্যাটারির ফাংশন বহুদিন ভালো থাকে।

আপনি ল্যাপটপ চার্জে বসিয়ে কাজ করতে পারবেন, এতে ব্যাটারির কোন ক্ষতি হবে না কিন্তু চার্জ হতে হয়তো একটু সময় নিবে। কিন্তু যদি লক্ষ্য করেন যে চার্জে বসিয়ে কাজ করা অবস্থায় ল্যাপটপের নিচের অংশ গরম হয়ে যাচ্ছে, তাহলে তৎক্ষণাৎ কাজ বন্ধ করে এবং চার্জার খুলে ল্যাপটপটি একটু ঠান্ডা হতে দিন। নাহলে ল্যাপটপ ওভারহিট হয়ে স্লো হয়ে যাবে।

শেষ কথা

আশা করি নতুন ল্যাপটপ কেনার পর করণীয় কাজগুলো সম্পর্কে জানার পরে সাধের ল্যাপটপটির যত্ন নিতে আপনার আর কোন অসুবিধা হবে না। তার সাথে সাথে ল্যাপটপটি সাবধানে রাখতে যেন ভুলবেন না। ঠিকমতো পরিচর্যা করলে নতুন ল্যাপটপ অনেক দিন পর্যন্ত নতুনের মতো থাকবে। আর বিনা সার্ভিসিংয়ে বছরের পর বছর নিশ্চিন্তে ব্যবহারও করতে পারবেন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url